সার ও জ্বালানি তেলসহ ৩০ জাহাজ যমুনার চরে ….বিদ্যুতের দাম বাড়ায়….

সার ও জ্বালানি তেলসহ ৩০ জাহাজ আটকে গেছে যমুনার চরে : বাঘাবাড়ী বন্দর অচল হওয়ার উপক্রম
জহুরুল ইসলাম, পাবনা
যমুনা নদীতে আবার ভয়াবহ নাব্য সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। ফলে গত ৪/৫ দিনেও ৫৫ হাজার বস্তা রাসানিক সার ও তেলবাহী জাহাজ এবং কার্গো বাঘাবাড়ী বন্দরে ভিড়তে পারছে না। আবার অচল হওয়ার উপক্রম হয়েছে বাঘাবাড়ী নৌ-বন্দর। অপর দিকে তেল ও সারবাহী বার্জ এবং কার্গোগুলো ভিড়তে না পারায় গোটা উত্তরাঞ্চলে জ্বালানি তেল ও রাসানিক সারশূন্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এদিকে চলতি শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত ড্রেজিং ছাড়া বাঘাবাড়ী ঘাটে নৌচলাচল স্বাভাবিক হবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সরেজমিন গিয়ে জানা গেছে, যমুনা নদীর নাব্য সঙ্কটের কারণে বাঘাবাড়ী বন্দরের ২৫ কিলোমিটার ভাটিতে বেড়া উপজেলার মোহনগঞ্জ, পেঁচাখোলা, নাকালিয়া ও কৈটোলায় ৫৫ হাজার বস্তা রাসানিক সার এবং ৪১ লাখ লিটার জ্বালানি তেলবাহী ১৫টি কার্গোসহ ৩০টি জাহাজ ৭ থেকে ১০ দিন ধরে আটকা পড়ে রয়েছে। ফলে বাঘাবাড়ী নৌবন্দরে সার ও জ্বালানি তেলবাহী কার্গো ভিড়তে না পারায় ক্রমেই সার এবং তেলশূন্য হয়ে পড়ছে বাঘাবাড়ী তেল ডিপোর আপদকালীন মজুত।
বিপিসির বাঘাবাড়ী অয়েল ডিপো সূত্র জানায়, ৫৫ হাজার বস্তা সার ও ৪১ লাখ লিটার জ্বালানি তেল নিয়ে ৩০টি শ্যালো ড্রাফট ট্যাংকার, সারবাহী ও ক্লিংকারবাহী জাহাজ মানিকগঞ্জের শিবালয় ও পাবনার পেঁচাখোলা, মোহনগঞ্জ, নাকালিয়া ও কৈটোলা এলাকায় নোঙর করে রয়েছে।
সূত্র আরও জানায়, যমুনা নদীর মোহনগঞ্জ, পেঁচাখোলা, নাকালিয়া, হরিরামপুর, মাছখালী, রাকসা ও নগরবাড়ী পয়েন্টে একটি ড্রেজার দিয়ে অপরিকল্পিত ড্রেজিং করায় নাব্য বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না। তাছাড়া ওই ড্রেজার দিয়ে যেভাবে মাটি বা বালি কাটা হচ্ছে, তাতে সরকারের শুধু টাকাই গচ্ছা যাচ্ছে, কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। ড্রেজার দিয়ে বালি কাটার পর সে বালি আবার নদীতেই পড়ছে। ফলে ভরাট হয়ে যাচ্ছে আবার নৌ-চ্যানেল।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের বাঘাবাড়ী ডিপো সূত্র জানায়, বাঘাবাড়ী অয়েল ডিপো থেকে উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় গড়ে প্রতিদিন ৮ হাজার বস্তা সার ও ২৭ লাখ লিটার জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে ডিজেলের চাহিদা রয়েছে সবচেয়ে বেশি। জাহাজ ভিড়তে না পারায় বাঘাবাড়ী বাফার গুদামের সার ডিলারদের মধ্যে সার বিতরণ করা অসুবিধা হবে বলে ঘাটের শ্রমিক জামাল আমার দেশকে জানায়।
বিআইডব্লিউটিএ বাঘাবাড়ী অফিসের ম্যানেজার আমার দেশকে বলেন, বাঘাবাড়ী নৌ-বন্দরের সার্বিক চিত্র তুলে ধরে অবিলম্বে ড্রেজিংয়ের পরামর্শ দিয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তিনি আরও বলেন, ৬ ফুট ড্রাফটের জাহাজগুলোকে এই রুটে না আসার পরামর্শ দেয়া হলেও বার্জ ও জাহাজ মালিকরা তা মানছেন না। তাই এই বড় জাহাজগুলো ডুবোচরে আটকে যাচ্ছে।
এদিকে যমুনা নদীর নাব্য ঠিক রাখতে বেড়া উপজেলার মোহনগঞ্জ এবং মানিকগঞ্জের শিবালয়ে দুই মাস ধরে ড্রেজিং করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৪ লাখ ঘনফুট বালি অপসারণ করা হয়েছে। এ জন্য ঠিকাদারকে কয়েক কোটি টাকার বিলও পরিশোধ করা হয়েছে। কিন্তু ২/৩ দিন পরেই খননকৃত নদী আবার বালিতে ভরে গেছে। বন্ধ হয়ে গেছে বাঘাবাড়ী নৌ-চ্যানেল। নদীর গভীরতা আগের অবস্থায় রয়েছে।
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় চালের বাজার অস্থির
কাজী জেবেল
বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে চালের বাজার ফের অস্থির হওয়ার আশঙ্কা করছেন মিল মালিক, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা। সরকার বিদ্যুতের দাম শতকরা ৪ থেকে ১০ ভাগ বাড়ানোর ঘোষণা দেয়ার পর চালের বাজারে এর প্রভাব পড়বে বলে তারা উল্লেখ করেছেন। এর ফলে মিলেই প্রতি কেজিতে চালের উত্পাদন খরচ বাড়বে দশমিক ২৫ টাকা। একই হারে বাড়বে অন্যান্য খরচ। লোডশেডিংয়ের কারণে কমবে চালের উত্পাদন। এছাড়া বিভিন্ন পণ্যের কন্টেইনারে কোটি কোটি টাকার চাল প্রশাসনের সহযোগিতায় বিদেশে পাচার হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন ব্যবসায়ীরা। এদিকে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাজারে সরকারের উল্লেখযোগ্য কোনো মনিটরিং নেই বলে জানা গেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত কয়েক মাস যাবত্ দ্রব্যমূল্যের চরম ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। এরপর আবার বিদ্যুতের বাড়তি দাম যেন মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। তাদের মতে, বিদুতের দাম বৃদ্ধির প্রভাবে অন্যান্য পণ্যের দামও বাড়বে। এতে নিম্নবিত্ত পরিবার খাদ্য সঙ্কটে পড়বে। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের ভোগান্তিও হবে বলে মত প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। মিল মালিক, পাইকারি ব্যবসায়ী ও রাজধানীর বিভিন্ন বাজারের খুচরা বিক্রেতা এবং ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
এদিকে সরকারের দ্রব্যমূল্য সংক্রান্ত টাস্কফোর্সের এক রিপোর্টে জিনিসপত্রের দাম বাড়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, নিত্যপণ্যের প্রকৃত চাহিদা, উত্পাদন ও আমদানি সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট তথ্য সরকারের কাছে না থাকায় পর্যাপ্ত ঋণ সুবিধা পেয়েও অসাধু ব্যবসায়ীদের ধান ও চাল মজুত করা, ব্যাংক থেকে পাওয়া নগদ অর্থের অপব্যবহার, ডাল, মসলাসহ অন্যান্য পণ্যের উত্পাদন কমে যাওয়ায় আমদানি নির্ভর হয়ে পড়া, টিসিবি’র আমদানির ব্যাপারে আগাম পরিকল্পনার অভাব, মজুতবিরোধী আইন না থাকা ও যানবহনের অতিরিক্ত ভাড়া আদায়। এ বিষয়ে ব্যবসায়ীরা বলেন, সরকারের এ রিপোর্টেই তাদের ব্যর্থতা ফুটে উঠেছে। সরকার বাজার ব্যবস্থা ও বাণিজ্য সংক্রান্ত বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে পারেনি। ফলে প্রতিটি জিনিসের দাম মানুষের ক্রয়সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নওগাঁর চাল উত্পাদনকারী মিলে প্রতি কেজি নাজিরশাইল চাল মানভেদে ৩৭ দশমিক ৫০ টাকা থেকে ৪৫ দশমিক ২৫ টাকা, মিনিকেট ৩৬ দশমিক ১৫ টাকা থেকে ৪০ দশমিক ২০ টাকা, কাটারিভোগ ৬১ দশমিক ৬০ টাকা, পোলাও চাল ৭০ থেকে ৭৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। রাজধানীর পাইকারি বাজার মিরপুর কৃষি মার্কেট গতকাল মোটা চাল ২৭ দশমিক ৮৬ টাকা, পাইজম মানভেদে ৩২ দশমিক ৬০ টাকা থেকে ৩৩ দশমিক ৫০ টাকা, মিনিকেট ৩৯ দশমিক ৫০ টাকা থেকে ৪৩ টাকা, নাজিরশাইল মানভেদে ৩৮ টাকা থেকে ৪৬ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। আর কারওয়ানবাজারের বিক্রেতারা জানান, নাজিরশাইল মানভেদে ৪১ থেকে ৪৮, মিনিকেট ৪১ থেকে ৪৪, পাইজম ৩৩ থেকে ৩৫, পোলাও ৭৫ থেকে ৮০, মোটা চাল ২৮ থেকে ৩০ টাকা, স্বর্ণা ও গুটি (মোটা চাল) ৩২ থেকে ৩৩ টাকা দরে বিক্রি করছেন। বিক্রেতারা জানান, এক সপ্তাহের ব্যবধানে মোটা চালের দাম কেজিতে এক টাকা কমেছে। চালের চড়া দাম সম্পর্কে খুচরা বিক্রেতারা বলেন, পাইকারি বাজারে চালের দাম বেশি। কারওয়ানবাজারের চাটখিল রাইস এজেন্সির মালিক বেলাল হোসেন বলেন, পাইকারি বাজারে চালের দামের সঙ্গে প্রতি কেজি চালে ২৫ পয়সা আড়তদারি, প্রতি বস্তায় ৫ টাকা কোয়েলি অতিরিক্ত দিতে হয়। এরসঙ্গে যোগ হয় পরিবহন খরচ। তাই পাইকারি ও খুচরা বাজারে প্রতি কেজি চালে দুই থেকে তিন টাকা ব্যবধান হয়। আর পাইকারি বিক্রেতা মডার্ন রাইস এজেন্সির মালিক দেলোয়ার জানান, মিলাররা ধানের দাম বেশি বলে চালের দাম বেশি নেন। আমরাও বেশি দামে বিক্রি করি। নওগাঁর নাহিদ রাইস মিলের মালিক হাজী স্বপন বলেন, কয়েকটি কারণে দেশে ধানের দাম বেশি। প্রথমত, সব পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় ধান চাষে খরচ বেশি হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, প্রশাসনের সহযোগিতায় প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার চাল বিভিন্ন কোম্পানির মাধ্যমে বিদেশে পাচার হচ্ছে। তৃতীয়ত, কতিপয় ধনবান ব্যক্তি ধান ও চাল মজুত করে দাম বাড়াচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, এসব কারণে প্রকৃত মিল মালিকদের প্রচুর বিনিয়োগ করতে গিয়ে অনেকে ব্যবসায়িকভাবে মার খাচ্ছেন। মুনাফা কমে গেছে। এছাড়া বিদ্যুতের দাম বাড়ায় মিলেই প্রতি কেজি চালের উত্পাদন ব্যয় ২৫ পয়সা বাড়বে।
রাজধানীর বাজার ঘুরে দেখা গেছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য চড়া দামেই বিক্রি হচ্ছে। তবে চিনি ও পেঁয়াজের দাম কিছুটা কমেছে। গতকাল কারওয়ানবাজারে চিনি ৫০ টাকা, সয়াবিন তেল (বোতলজাত) ৮০ থেকে ৮৫, খোলা তেল ৬৫ থেকে ৬৬ টাকা, মসুর ডাল মানভেদে ৮০ থেকে ১১০, হলুদ ২১০ থেকে ২২৫, রসুন ১০৫ থেকে ১২০ টাকা, আদা ৯০ থেকে ১১০, মুগ ডাল ১০৫ থেকে ১১০, পেঁয়াজ ২৮ থেকে ৩০, মুরগি ১৩৫ থেকে ১৪৫, আটা ২৩ টাকা, ময়দা ৩৩ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। ডিমের হালি ২৪ টাকা। সরকার দাম বৃদ্ধির জন্য ব্যবসায়ীদের কারসাজিকে দায়ী করলেও বাজারে উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো মনিটরিং নেই। আল আরাবিয়া গ্রোসারির মালিক মোঃ মনিরুল ইসলাম বলেন, বাজারে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মনিটরিং দেখা যায় না। তবে মাঝে মাঝে সরকারি লোকজন বাজার করতে এসে দাম সম্পর্কে জানতে চান। চাটখিল রাইস এজেন্সির মালিক বেলাল হোসেন বলেন, বাজার মনিটরিং করতে তেমন একটা দেখা যায় না।
বহুমুখী সমস্যায় দুর্ভোগে নগরবাসী :
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি যানজট বিদ্যুত্ গ্যাস ও পানির সঙ্কট তীব্র
রকিবুল হক
ঘরে-বাইরে নানা সমস্যায় রাজধানীবাসীর দুর্ভোগ চরম রূপ নিয়েছে। বাসায় বিদ্যুত্ নেই, পানি নেই, গ্যাসের চুলায় আগুন জ্বলে টিমটিম করে, দিনে-রাতে মশার উপদ্রব আর ঘর থেকে বের হলেই যানজট। যানবাহন সঙ্কট, যাতায়াতে দুর্ভোগ, ছিনতাইকারী আর মলম পার্টির উপদ্রব, বাজারে গেলে আকাশছোঁয়া দ্রব্যমূল্য—এমন বহুমুখী সমস্যায় নগরবাসীর এখন হাঁসফাঁস অবস্থা। দিনে দিনে যেন বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে রাজধানী ঢাকা। জনজীবনের কোথাও স্বস্তি নেই। নেই নিরাপত্তা। শিগগিরই এসব সমস্যা সমাধানের তেমন কোনো সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না। সরকার নানামুখী সিদ্ধান্ত আর পরিকল্পনা নিলেও তা বাস্তবায়ন সুদূরপরাহত। জনদুর্ভোগ কমা তো দূরের কথা, দিনদিন আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ। বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্রমবর্ধমান নাগরিক সমস্যার সমাধানে পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করলেও ৫/৭ বছর লাগবে তার ফলাফল পেতে। তাই সমস্যা দিনদিন বাড়বেই। তবে সরকার যেসব উদ্যোগ নিচ্ছে তা আরও সুষ্ঠু ও গতিসম্পন্ন হওয়া দরকার বলেও বিশেষজ্ঞরা অভিমত প্রকাশ করেছেন।
বিদ্যুত্, গ্যাস ও পানি সঙ্কট : বিদ্যুত্, গ্যাস ও পানি সঙ্কট নগরবাসীর একটি নিয়মিত সমস্যা। গরমের মৌসুম পুরোপুরি শুরু না হতেই বিদ্যুতের লোডশেডিং অসহনীয় হয়ে উঠেছে। দিনে ও রাতের অধিকাংশ সময়ই বিদ্যুত্ থাকছে না। এতে কলকারখানা, অফিস-আদালতের কর্মকাণ্ডে যেমন ব্যাঘাত ঘটছে, তেমনি আবাসিক এলাকার মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বিদ্যুত্ না থাকায় গরমে কষ্ট করতে হচ্ছে। এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা চলছে কিন্তু বিদ্যুত্ সঙ্কটে ছাত্রছাত্রীরা লেখাপড়া করতে পারছে না। পিডিবির হিসাবে বৃহস্পতিবার ঢাকায় লোডশেডিং করা হয়েছে ১৮২ মেগাওয়াট। চাহিদা কম দেখানোর কারণে লোডশেডিংয়ের পরিমাণও কম প্রদর্শিত হয়েছে। বাস্তবে ঢাকায় এখন বিদ্যুত্ ঘাটতি ৫শ’ মেগাওয়াটের বেশি বলে বিতরণ কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে।
বিদ্যুত্ সঙ্কটের হাত ধরে পানি সঙ্কটও প্রকট হয়ে উঠেছে। বিদ্যুতের অভাবে পানি তোলা যাচ্ছে না। ফলে বিভিন্ন এলাকায় পানির জন্য হাহাকার শুরু হয়েছে। পানি না থাকায় গোসল ছাড়াই অফিসে যেতে হয় অনেক চাকরিজীবীকে। রান্নাবান্না, ধোয়ামোছার কাজ তো বিঘ্নিত হচ্ছেই।
এছাড়া গ্যাস সঙ্কটের কারণে রান্নাবান্নায় অচলাবস্থা সৃষ্টি হচ্ছে। মগবাজার, রামপুরা ও বনশ্রীসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে নয়াটোলা, গ্রিনওয়েসহ এসব এলাকার বাসায় দিনের বেলা ঠিকমতো গ্যাস থাকে না। তাই অনেক রাতে গ্যাস এলে সারাদিনের রান্না তখনই সেরে নিতে হচ্ছে। গ্যাস সমস্যার কারণে মাটির বা কেরোসিনের চুলা ব্যবহার করছে অনেকে। এতে একদিকে গ্যাসের বিল নিয়মিত পরিশোধ করতে হচ্ছে; অন্যদিকে কাঠ বা তেলের জন্য অতিরিক্ত টাকা খরচ করতে হচ্ছে। আর ভোগান্তি তো আছেই।
যাতায়াত সমস্যা : বর্তমানে রাজধানীর প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে যাতায়াত সমস্যা। ভয়াবহ যানজট, প্রয়োজনীয় যানবাহন সঙ্কট আর ভাঙাচোরা রাস্তার কারণে এই দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ। সূত্রমতে, রাজধানীতে যানজটের মাত্রা প্রতিদিনই সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সপ্তাহের প্রতিদিন সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত এই যানজট থাকে। তবে রোববার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এর মাত্রা থাকে বেশি। গত কয়েকদিন ধরে গরম পড়তে শুরু করায় যানজটে যাত্রীসাধারণের দুর্ভোগও বেড়েছে। যানজটের কারণে প্রতিটি সিগন্যালে অনেক সময় দাঁড়িয়ে থাকায় ১৫/২০ মিনিটের পথ পার হতে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত লেগে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। অটোসিগন্যাল বাতিগুলো কোনো কাজে আসছে না। ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশারায় ইচ্ছামতো সিগন্যাল দিয়ে গাড়ি পারাপার করা হয়। দীর্ঘসময় ভিড়ের মধ্যে গাড়িতে থাকায় গরমে যাত্রীদের নাভিশ্বাস উঠছে। যানজটের পাশাপাশি যানবাহন সঙ্কটেরও অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে, সকালে অফিস ও স্কুল-কলেজ শুরুর সময় এবং বিকালে ছুটির সময় সংশ্লিষ্টদের যানবাহনের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। কারণ যাত্রীর তুলনায় পর্যাপ্ত যানবাহন নেই। তারপর আবার সিটিং সার্ভিস, গেট লক, ডাইরেক্ট, কাউন্টার সার্ভিস, লোকাল নানা নামে পাবলিক বাস কর্তৃপক্ষের দৌরাত্ম্য তো আছেই। অপরদিকে অনিয়ন্ত্রিত ট্যাক্সি ক্যাব, সিএনজি অটোরিকশা— এসব বাহনে যেমন ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করা হয় তেমনি পছন্দের জায়গা ছাড়া যেতে চায় না। সব সড়কে রিকশা না চলায় কম দূরত্বে যাতায়াতকারী সাধারণ মানুষকেও পোহাতে হয় দুর্ভোগ। অসুস্থ, মহিলা ও শিশুদের বাধ্য হয়েই অনেক পথ হেঁটে যাতায়াত করতে হয়। যাতায়াতের আরেক সমস্যা ভাঙাচোরা রাস্তা। বিভিন্ন কাজে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি অব্যাহত থাকায় আবাসিক এলাকার অধিকাংশ রাস্তা এমনকি প্রধান সড়কেরও অনেক জায়গা জরাজীর্ণ ও ভাঙাচোরা থাকে। ফলে যানবাহন ও মানুষের চলাচলে চরম সমস্যা হচ্ছে। যাত্রীদের যাতায়াত সমস্যার দ্রুত সমাধানে সমন্বিত কোনো উদ্যোগ কর্তৃপক্ষের আছে বলে মনে হয় না।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি : নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম প্রতিদিনই বাড়ছে। চাল, ডাল, তেল, তরিতরকারি, মাছ-মাংস, মসলাসহ সব জিনিসের দামই আকাশছোঁয়া। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচারণা হলেও তা নিয়ন্ত্রণ করতে বর্তমান প্রশাসন যেন ব্যর্থ হচ্ছে। বরং সরকারের এ নিয়ে তেমন কোনো মাথাব্যথা নেই বলেও মনে হচ্ছে। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের খেয়ে-পরে জীবনধারণ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
লাগামহীন বাড়িভাড়া : দ্রব্যমূল্যের পাশাপাশি রাজধানীতে লাগামহীনভাবে বাড়ছে বাড়িভাড়া। ফলে কম আয়ের মানুষের ভাড়া বাসায় বসবাস করা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। এ বিষয়ে যেন কোনো নিয়মকানুন নেই। বাড়িওয়ালাদের ইচ্ছেমতো চলেন ভাড়াটেরা। বাড়িভাড়া নিয়ে কাগজে-কলমে একটি আইন থাকলেও তার কোনো কার্যকারিতা নেই বললেই চলে। ফলে বাড়িওয়ালাদের বিরুদ্ধে ইচ্ছেমতো ভাড়া বৃদ্ধি, ভাড়াটেদের ওপর নানা শর্তারোপসহ বিভিন্নভাবে নির্যাতনেরও অভিযোগ পাওয়া যায়।
আইনশৃঙ্খলার অবনতি : সারাদেশের মতো সম্প্রতি রাজধানীতেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। নগরবাসীর জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই। ঘরে-বাইরে সবখানেই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে মানুষ। চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের পাশাপাশি সন্ত্রাসীদের তত্পরতা বাড়ায় জনসাধারণকে সবসময় আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হচ্ছে। সম্প্রতি রাজধানীতে সন্ত্রাসীদের হামলায় ওয়ার্ড কমিশনার, ব্যবসায়ী, ছাত্রসহ বেশ কয়েকজনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। অপরদিকে ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকদের চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে নগরবাসীর মাঝে স্বস্তি নেই।
মশার উপদ্রব : জনদুর্ভোগের সারিতে যোগ হয়েছে মশার ভয়াবহ উপদ্রব। সম্প্রতি ব্যাপকহারে মশা বৃদ্ধি পাওয়ায় দিনের বেলায়ও ঘরে মশারি টাঙিয়ে থাকতে হচ্ছে। মশা নিধনের ব্যাপারে ডিসিসির তেমন উদ্যোগ নেই। কোনো জায়গায় নামমাত্র ওষুধ স্প্রে করা হলেও তাতে কোনো কাজ হচ্ছে না বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ।
রাজধানীর নানা সমস্যা সম্পর্কে বিশিষ্ট নগরবিদ ও ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, বহুদিন ধরে এসব সমস্যা বিরাজমান। তাই যতই দিন যাবে সমস্যা ততই বাড়বে। পুঞ্জীভূত সমস্যার দিকে আরও সুষ্ঠু পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে হবে। যানজট ও বিদ্যুত্ সমস্যার সমাধানে সরকার বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়া শুরু করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যানজট কমাতে স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপে কিছু কাজ হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে নতুন ট্রেন ও বাসলাইন চালু, আরও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে পাতাল রেল চালু এবং ঢাকায় যাতে নতুন মানুষ না আসে সেজন্য বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। ঢাকার চারপাশের জলাভূমি সংরক্ষণ করতে হবে। বুড়িগঙ্গা উদ্ধারে সরকারকে আরও সুপরিকল্পিতভাবে হাত দেয়া উচিত ছিল বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, নগরীর সমস্যা সমাধানে সরকারের শুধু সদিচ্ছা থাকলেই হবে না; পরিকল্পনাগুলো আরও সুপরিকল্পিত হতে হবে এবং তাতে জনগণের অংশগ্রহণ ও সচেতনতা বাড়ানো দরকার।
সার ও জ্বালানি তেলসহ ৩০ জাহাজ আটকে গেছে যমুনার চরে : বাঘাবাড়ী বন্দর অচল হওয়ার উপক্রম
জহুরুল ইসলাম, পাবনা
যমুনা নদীতে আবার ভয়াবহ নাব্য সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। ফলে গত ৪/৫ দিনেও ৫৫ হাজার বস্তা রাসানিক সার ও তেলবাহী জাহাজ এবং কার্গো বাঘাবাড়ী বন্দরে ভিড়তে পারছে না। আবার অচল হওয়ার উপক্রম হয়েছে বাঘাবাড়ী নৌ-বন্দর। অপর দিকে তেল ও সারবাহী বার্জ এবং কার্গোগুলো ভিড়তে না পারায় গোটা উত্তরাঞ্চলে জ্বালানি তেল ও রাসানিক সারশূন্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এদিকে চলতি শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত ড্রেজিং ছাড়া বাঘাবাড়ী ঘাটে নৌচলাচল স্বাভাবিক হবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সরেজমিন গিয়ে জানা গেছে, যমুনা নদীর নাব্য সঙ্কটের কারণে বাঘাবাড়ী বন্দরের ২৫ কিলোমিটার ভাটিতে বেড়া উপজেলার মোহনগঞ্জ, পেঁচাখোলা, নাকালিয়া ও কৈটোলায় ৫৫ হাজার বস্তা রাসানিক সার এবং ৪১ লাখ লিটার জ্বালানি তেলবাহী ১৫টি কার্গোসহ ৩০টি জাহাজ ৭ থেকে ১০ দিন ধরে আটকা পড়ে রয়েছে। ফলে বাঘাবাড়ী নৌবন্দরে সার ও জ্বালানি তেলবাহী কার্গো ভিড়তে না পারায় ক্রমেই সার এবং তেলশূন্য হয়ে পড়ছে বাঘাবাড়ী তেল ডিপোর আপদকালীন মজুত।
বিপিসির বাঘাবাড়ী অয়েল ডিপো সূত্র জানায়, ৫৫ হাজার বস্তা সার ও ৪১ লাখ লিটার জ্বালানি তেল নিয়ে ৩০টি শ্যালো ড্রাফট ট্যাংকার, সারবাহী ও ক্লিংকারবাহী জাহাজ মানিকগঞ্জের শিবালয় ও পাবনার পেঁচাখোলা, মোহনগঞ্জ, নাকালিয়া ও কৈটোলা এলাকায় নোঙর করে রয়েছে।
সূত্র আরও জানায়, যমুনা নদীর মোহনগঞ্জ, পেঁচাখোলা, নাকালিয়া, হরিরামপুর, মাছখালী, রাকসা ও নগরবাড়ী পয়েন্টে একটি ড্রেজার দিয়ে অপরিকল্পিত ড্রেজিং করায় নাব্য বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না। তাছাড়া ওই ড্রেজার দিয়ে যেভাবে মাটি বা বালি কাটা হচ্ছে, তাতে সরকারের শুধু টাকাই গচ্ছা যাচ্ছে, কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। ড্রেজার দিয়ে বালি কাটার পর সে বালি আবার নদীতেই পড়ছে। ফলে ভরাট হয়ে যাচ্ছে আবার নৌ-চ্যানেল।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের বাঘাবাড়ী ডিপো সূত্র জানায়, বাঘাবাড়ী অয়েল ডিপো থেকে উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় গড়ে প্রতিদিন ৮ হাজার বস্তা সার ও ২৭ লাখ লিটার জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে ডিজেলের চাহিদা রয়েছে সবচেয়ে বেশি। জাহাজ ভিড়তে না পারায় বাঘাবাড়ী বাফার গুদামের সার ডিলারদের মধ্যে সার বিতরণ করা অসুবিধা হবে বলে ঘাটের শ্রমিক জামাল আমার দেশকে জানায়।
বিআইডব্লিউটিএ বাঘাবাড়ী অফিসের ম্যানেজার আমার দেশকে বলেন, বাঘাবাড়ী নৌ-বন্দরের সার্বিক চিত্র তুলে ধরে অবিলম্বে ড্রেজিংয়ের পরামর্শ দিয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তিনি আরও বলেন, ৬ ফুট ড্রাফটের জাহাজগুলোকে এই রুটে না আসার পরামর্শ দেয়া হলেও বার্জ ও জাহাজ মালিকরা তা মানছেন না। তাই এই বড় জাহাজগুলো ডুবোচরে আটকে যাচ্ছে।
এদিকে যমুনা নদীর নাব্য ঠিক রাখতে বেড়া উপজেলার মোহনগঞ্জ এবং মানিকগঞ্জের শিবালয়ে দুই মাস ধরে ড্রেজিং করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৪ লাখ ঘনফুট বালি অপসারণ করা হয়েছে। এ জন্য ঠিকাদারকে কয়েক কোটি টাকার বিলও পরিশোধ করা হয়েছে। কিন্তু ২/৩ দিন পরেই খননকৃত নদী আবার বালিতে ভরে গেছে। বন্ধ হয়ে গেছে বাঘাবাড়ী নৌ-চ্যানেল। নদীর গভীরতা আগের অবস্থায় রয়েছে।
সরেজমিন গিয়ে জানা গেছে, যমুনা নদীর নাব্য সঙ্কটের কারণে বাঘাবাড়ী বন্দরের ২৫ কিলোমিটার ভাটিতে বেড়া উপজেলার মোহনগঞ্জ, পেঁচাখোলা, নাকালিয়া ও কৈটোলায় ৫৫ হাজার বস্তা রাসানিক সার এবং ৪১ লাখ লিটার জ্বালানি তেলবাহী ১৫টি কার্গোসহ ৩০টি জাহাজ ৭ থেকে ১০ দিন ধরে আটকা পড়ে রয়েছে। ফলে বাঘাবাড়ী নৌবন্দরে সার ও জ্বালানি তেলবাহী কার্গো ভিড়তে না পারায় ক্রমেই সার এবং তেলশূন্য হয়ে পড়ছে বাঘাবাড়ী তেল ডিপোর আপদকালীন মজুত।
বিপিসির বাঘাবাড়ী অয়েল ডিপো সূত্র জানায়, ৫৫ হাজার বস্তা সার ও ৪১ লাখ লিটার জ্বালানি তেল নিয়ে ৩০টি শ্যালো ড্রাফট ট্যাংকার, সারবাহী ও ক্লিংকারবাহী জাহাজ মানিকগঞ্জের শিবালয় ও পাবনার পেঁচাখোলা, মোহনগঞ্জ, নাকালিয়া ও কৈটোলা এলাকায় নোঙর করে রয়েছে।
সূত্র আরও জানায়, যমুনা নদীর মোহনগঞ্জ, পেঁচাখোলা, নাকালিয়া, হরিরামপুর, মাছখালী, রাকসা ও নগরবাড়ী পয়েন্টে একটি ড্রেজার দিয়ে অপরিকল্পিত ড্রেজিং করায় নাব্য বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না। তাছাড়া ওই ড্রেজার দিয়ে যেভাবে মাটি বা বালি কাটা হচ্ছে, তাতে সরকারের শুধু টাকাই গচ্ছা যাচ্ছে, কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। ড্রেজার দিয়ে বালি কাটার পর সে বালি আবার নদীতেই পড়ছে। ফলে ভরাট হয়ে যাচ্ছে আবার নৌ-চ্যানেল।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের বাঘাবাড়ী ডিপো সূত্র জানায়, বাঘাবাড়ী অয়েল ডিপো থেকে উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় গড়ে প্রতিদিন ৮ হাজার বস্তা সার ও ২৭ লাখ লিটার জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে ডিজেলের চাহিদা রয়েছে সবচেয়ে বেশি। জাহাজ ভিড়তে না পারায় বাঘাবাড়ী বাফার গুদামের সার ডিলারদের মধ্যে সার বিতরণ করা অসুবিধা হবে বলে ঘাটের শ্রমিক জামাল আমার দেশকে জানায়।
বিআইডব্লিউটিএ বাঘাবাড়ী অফিসের ম্যানেজার আমার দেশকে বলেন, বাঘাবাড়ী নৌ-বন্দরের সার্বিক চিত্র তুলে ধরে অবিলম্বে ড্রেজিংয়ের পরামর্শ দিয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তিনি আরও বলেন, ৬ ফুট ড্রাফটের জাহাজগুলোকে এই রুটে না আসার পরামর্শ দেয়া হলেও বার্জ ও জাহাজ মালিকরা তা মানছেন না। তাই এই বড় জাহাজগুলো ডুবোচরে আটকে যাচ্ছে।
এদিকে যমুনা নদীর নাব্য ঠিক রাখতে বেড়া উপজেলার মোহনগঞ্জ এবং মানিকগঞ্জের শিবালয়ে দুই মাস ধরে ড্রেজিং করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৪ লাখ ঘনফুট বালি অপসারণ করা হয়েছে। এ জন্য ঠিকাদারকে কয়েক কোটি টাকার বিলও পরিশোধ করা হয়েছে। কিন্তু ২/৩ দিন পরেই খননকৃত নদী আবার বালিতে ভরে গেছে। বন্ধ হয়ে গেছে বাঘাবাড়ী নৌ-চ্যানেল। নদীর গভীরতা আগের অবস্থায় রয়েছে।
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় চালের বাজার অস্থির
এদিকে সরকারের দ্রব্যমূল্য সংক্রান্ত টাস্কফোর্সের এক রিপোর্টে জিনিসপত্রের দাম বাড়ার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, নিত্যপণ্যের প্রকৃত চাহিদা, উত্পাদন ও আমদানি সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট তথ্য সরকারের কাছে না থাকায় পর্যাপ্ত ঋণ সুবিধা পেয়েও অসাধু ব্যবসায়ীদের ধান ও চাল মজুত করা, ব্যাংক থেকে পাওয়া নগদ অর্থের অপব্যবহার, ডাল, মসলাসহ অন্যান্য পণ্যের উত্পাদন কমে যাওয়ায় আমদানি নির্ভর হয়ে পড়া, টিসিবি’র আমদানির ব্যাপারে আগাম পরিকল্পনার অভাব, মজুতবিরোধী আইন না থাকা ও যানবহনের অতিরিক্ত ভাড়া আদায়। এ বিষয়ে ব্যবসায়ীরা বলেন, সরকারের এ রিপোর্টেই তাদের ব্যর্থতা ফুটে উঠেছে। সরকার বাজার ব্যবস্থা ও বাণিজ্য সংক্রান্ত বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে পারেনি। ফলে প্রতিটি জিনিসের দাম মানুষের ক্রয়সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নওগাঁর চাল উত্পাদনকারী মিলে প্রতি কেজি নাজিরশাইল চাল মানভেদে ৩৭ দশমিক ৫০ টাকা থেকে ৪৫ দশমিক ২৫ টাকা, মিনিকেট ৩৬ দশমিক ১৫ টাকা থেকে ৪০ দশমিক ২০ টাকা, কাটারিভোগ ৬১ দশমিক ৬০ টাকা, পোলাও চাল ৭০ থেকে ৭৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। রাজধানীর পাইকারি বাজার মিরপুর কৃষি মার্কেট গতকাল মোটা চাল ২৭ দশমিক ৮৬ টাকা, পাইজম মানভেদে ৩২ দশমিক ৬০ টাকা থেকে ৩৩ দশমিক ৫০ টাকা, মিনিকেট ৩৯ দশমিক ৫০ টাকা থেকে ৪৩ টাকা, নাজিরশাইল মানভেদে ৩৮ টাকা থেকে ৪৬ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। আর কারওয়ানবাজারের বিক্রেতারা জানান, নাজিরশাইল মানভেদে ৪১ থেকে ৪৮, মিনিকেট ৪১ থেকে ৪৪, পাইজম ৩৩ থেকে ৩৫, পোলাও ৭৫ থেকে ৮০, মোটা চাল ২৮ থেকে ৩০ টাকা, স্বর্ণা ও গুটি (মোটা চাল) ৩২ থেকে ৩৩ টাকা দরে বিক্রি করছেন। বিক্রেতারা জানান, এক সপ্তাহের ব্যবধানে মোটা চালের দাম কেজিতে এক টাকা কমেছে। চালের চড়া দাম সম্পর্কে খুচরা বিক্রেতারা বলেন, পাইকারি বাজারে চালের দাম বেশি। কারওয়ানবাজারের চাটখিল রাইস এজেন্সির মালিক বেলাল হোসেন বলেন, পাইকারি বাজারে চালের দামের সঙ্গে প্রতি কেজি চালে ২৫ পয়সা আড়তদারি, প্রতি বস্তায় ৫ টাকা কোয়েলি অতিরিক্ত দিতে হয়। এরসঙ্গে যোগ হয় পরিবহন খরচ। তাই পাইকারি ও খুচরা বাজারে প্রতি কেজি চালে দুই থেকে তিন টাকা ব্যবধান হয়। আর পাইকারি বিক্রেতা মডার্ন রাইস এজেন্সির মালিক দেলোয়ার জানান, মিলাররা ধানের দাম বেশি বলে চালের দাম বেশি নেন। আমরাও বেশি দামে বিক্রি করি। নওগাঁর নাহিদ রাইস মিলের মালিক হাজী স্বপন বলেন, কয়েকটি কারণে দেশে ধানের দাম বেশি। প্রথমত, সব পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় ধান চাষে খরচ বেশি হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, প্রশাসনের সহযোগিতায় প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার চাল বিভিন্ন কোম্পানির মাধ্যমে বিদেশে পাচার হচ্ছে। তৃতীয়ত, কতিপয় ধনবান ব্যক্তি ধান ও চাল মজুত করে দাম বাড়াচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, এসব কারণে প্রকৃত মিল মালিকদের প্রচুর বিনিয়োগ করতে গিয়ে অনেকে ব্যবসায়িকভাবে মার খাচ্ছেন। মুনাফা কমে গেছে। এছাড়া বিদ্যুতের দাম বাড়ায় মিলেই প্রতি কেজি চালের উত্পাদন ব্যয় ২৫ পয়সা বাড়বে।
রাজধানীর বাজার ঘুরে দেখা গেছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য চড়া দামেই বিক্রি হচ্ছে। তবে চিনি ও পেঁয়াজের দাম কিছুটা কমেছে। গতকাল কারওয়ানবাজারে চিনি ৫০ টাকা, সয়াবিন তেল (বোতলজাত) ৮০ থেকে ৮৫, খোলা তেল ৬৫ থেকে ৬৬ টাকা, মসুর ডাল মানভেদে ৮০ থেকে ১১০, হলুদ ২১০ থেকে ২২৫, রসুন ১০৫ থেকে ১২০ টাকা, আদা ৯০ থেকে ১১০, মুগ ডাল ১০৫ থেকে ১১০, পেঁয়াজ ২৮ থেকে ৩০, মুরগি ১৩৫ থেকে ১৪৫, আটা ২৩ টাকা, ময়দা ৩৩ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। ডিমের হালি ২৪ টাকা। সরকার দাম বৃদ্ধির জন্য ব্যবসায়ীদের কারসাজিকে দায়ী করলেও বাজারে উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো মনিটরিং নেই। আল আরাবিয়া গ্রোসারির মালিক মোঃ মনিরুল ইসলাম বলেন, বাজারে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মনিটরিং দেখা যায় না। তবে মাঝে মাঝে সরকারি লোকজন বাজার করতে এসে দাম সম্পর্কে জানতে চান। চাটখিল রাইস এজেন্সির মালিক বেলাল হোসেন বলেন, বাজার মনিটরিং করতে তেমন একটা দেখা যায় না।
বহুমুখী সমস্যায় দুর্ভোগে নগরবাসী :
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি যানজট বিদ্যুত্ গ্যাস ও পানির সঙ্কট তীব্র
রকিবুল হক

ঘরে-বাইরে নানা সমস্যায় রাজধানীবাসীর দুর্ভোগ চরম রূপ নিয়েছে। বাসায় বিদ্যুত্ নেই, পানি নেই, গ্যাসের চুলায় আগুন জ্বলে টিমটিম করে, দিনে-রাতে মশার উপদ্রব আর ঘর থেকে বের হলেই যানজট। যানবাহন সঙ্কট, যাতায়াতে দুর্ভোগ, ছিনতাইকারী আর মলম পার্টির উপদ্রব, বাজারে গেলে আকাশছোঁয়া দ্রব্যমূল্য—এমন বহুমুখী সমস্যায় নগরবাসীর এখন হাঁসফাঁস অবস্থা। দিনে দিনে যেন বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে রাজধানী ঢাকা। জনজীবনের কোথাও স্বস্তি নেই। নেই নিরাপত্তা। শিগগিরই এসব সমস্যা সমাধানের তেমন কোনো সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না। সরকার নানামুখী সিদ্ধান্ত আর পরিকল্পনা নিলেও তা বাস্তবায়ন সুদূরপরাহত। জনদুর্ভোগ কমা তো দূরের কথা, দিনদিন আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ। বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্রমবর্ধমান নাগরিক সমস্যার সমাধানে পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করলেও ৫/৭ বছর লাগবে তার ফলাফল পেতে। তাই সমস্যা দিনদিন বাড়বেই। তবে সরকার যেসব উদ্যোগ নিচ্ছে তা আরও সুষ্ঠু ও গতিসম্পন্ন হওয়া দরকার বলেও বিশেষজ্ঞরা অভিমত প্রকাশ করেছেন।
বিদ্যুত্, গ্যাস ও পানি সঙ্কট : বিদ্যুত্, গ্যাস ও পানি সঙ্কট নগরবাসীর একটি নিয়মিত সমস্যা। গরমের মৌসুম পুরোপুরি শুরু না হতেই বিদ্যুতের লোডশেডিং অসহনীয় হয়ে উঠেছে। দিনে ও রাতের অধিকাংশ সময়ই বিদ্যুত্ থাকছে না। এতে কলকারখানা, অফিস-আদালতের কর্মকাণ্ডে যেমন ব্যাঘাত ঘটছে, তেমনি আবাসিক এলাকার মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বিদ্যুত্ না থাকায় গরমে কষ্ট করতে হচ্ছে। এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা চলছে কিন্তু বিদ্যুত্ সঙ্কটে ছাত্রছাত্রীরা লেখাপড়া করতে পারছে না। পিডিবির হিসাবে বৃহস্পতিবার ঢাকায় লোডশেডিং করা হয়েছে ১৮২ মেগাওয়াট। চাহিদা কম দেখানোর কারণে লোডশেডিংয়ের পরিমাণও কম প্রদর্শিত হয়েছে। বাস্তবে ঢাকায় এখন বিদ্যুত্ ঘাটতি ৫শ’ মেগাওয়াটের বেশি বলে বিতরণ কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে।
বিদ্যুত্ সঙ্কটের হাত ধরে পানি সঙ্কটও প্রকট হয়ে উঠেছে। বিদ্যুতের অভাবে পানি তোলা যাচ্ছে না। ফলে বিভিন্ন এলাকায় পানির জন্য হাহাকার শুরু হয়েছে। পানি না থাকায় গোসল ছাড়াই অফিসে যেতে হয় অনেক চাকরিজীবীকে। রান্নাবান্না, ধোয়ামোছার কাজ তো বিঘ্নিত হচ্ছেই।
এছাড়া গ্যাস সঙ্কটের কারণে রান্নাবান্নায় অচলাবস্থা সৃষ্টি হচ্ছে। মগবাজার, রামপুরা ও বনশ্রীসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে নয়াটোলা, গ্রিনওয়েসহ এসব এলাকার বাসায় দিনের বেলা ঠিকমতো গ্যাস থাকে না। তাই অনেক রাতে গ্যাস এলে সারাদিনের রান্না তখনই সেরে নিতে হচ্ছে। গ্যাস সমস্যার কারণে মাটির বা কেরোসিনের চুলা ব্যবহার করছে অনেকে। এতে একদিকে গ্যাসের বিল নিয়মিত পরিশোধ করতে হচ্ছে; অন্যদিকে কাঠ বা তেলের জন্য অতিরিক্ত টাকা খরচ করতে হচ্ছে। আর ভোগান্তি তো আছেই।
যাতায়াত সমস্যা : বর্তমানে রাজধানীর প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে যাতায়াত সমস্যা। ভয়াবহ যানজট, প্রয়োজনীয় যানবাহন সঙ্কট আর ভাঙাচোরা রাস্তার কারণে এই দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ। সূত্রমতে, রাজধানীতে যানজটের মাত্রা প্রতিদিনই সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সপ্তাহের প্রতিদিন সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত এই যানজট থাকে। তবে রোববার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এর মাত্রা থাকে বেশি। গত কয়েকদিন ধরে গরম পড়তে শুরু করায় যানজটে যাত্রীসাধারণের দুর্ভোগও বেড়েছে। যানজটের কারণে প্রতিটি সিগন্যালে অনেক সময় দাঁড়িয়ে থাকায় ১৫/২০ মিনিটের পথ পার হতে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত লেগে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। অটোসিগন্যাল বাতিগুলো কোনো কাজে আসছে না। ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশারায় ইচ্ছামতো সিগন্যাল দিয়ে গাড়ি পারাপার করা হয়। দীর্ঘসময় ভিড়ের মধ্যে গাড়িতে থাকায় গরমে যাত্রীদের নাভিশ্বাস উঠছে। যানজটের পাশাপাশি যানবাহন সঙ্কটেরও অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে, সকালে অফিস ও স্কুল-কলেজ শুরুর সময় এবং বিকালে ছুটির সময় সংশ্লিষ্টদের যানবাহনের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। কারণ যাত্রীর তুলনায় পর্যাপ্ত যানবাহন নেই। তারপর আবার সিটিং সার্ভিস, গেট লক, ডাইরেক্ট, কাউন্টার সার্ভিস, লোকাল নানা নামে পাবলিক বাস কর্তৃপক্ষের দৌরাত্ম্য তো আছেই। অপরদিকে অনিয়ন্ত্রিত ট্যাক্সি ক্যাব, সিএনজি অটোরিকশা— এসব বাহনে যেমন ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করা হয় তেমনি পছন্দের জায়গা ছাড়া যেতে চায় না। সব সড়কে রিকশা না চলায় কম দূরত্বে যাতায়াতকারী সাধারণ মানুষকেও পোহাতে হয় দুর্ভোগ। অসুস্থ, মহিলা ও শিশুদের বাধ্য হয়েই অনেক পথ হেঁটে যাতায়াত করতে হয়। যাতায়াতের আরেক সমস্যা ভাঙাচোরা রাস্তা। বিভিন্ন কাজে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি অব্যাহত থাকায় আবাসিক এলাকার অধিকাংশ রাস্তা এমনকি প্রধান সড়কেরও অনেক জায়গা জরাজীর্ণ ও ভাঙাচোরা থাকে। ফলে যানবাহন ও মানুষের চলাচলে চরম সমস্যা হচ্ছে। যাত্রীদের যাতায়াত সমস্যার দ্রুত সমাধানে সমন্বিত কোনো উদ্যোগ কর্তৃপক্ষের আছে বলে মনে হয় না।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি : নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম প্রতিদিনই বাড়ছে। চাল, ডাল, তেল, তরিতরকারি, মাছ-মাংস, মসলাসহ সব জিনিসের দামই আকাশছোঁয়া। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচারণা হলেও তা নিয়ন্ত্রণ করতে বর্তমান প্রশাসন যেন ব্যর্থ হচ্ছে। বরং সরকারের এ নিয়ে তেমন কোনো মাথাব্যথা নেই বলেও মনে হচ্ছে। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের খেয়ে-পরে জীবনধারণ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
লাগামহীন বাড়িভাড়া : দ্রব্যমূল্যের পাশাপাশি রাজধানীতে লাগামহীনভাবে বাড়ছে বাড়িভাড়া। ফলে কম আয়ের মানুষের ভাড়া বাসায় বসবাস করা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। এ বিষয়ে যেন কোনো নিয়মকানুন নেই। বাড়িওয়ালাদের ইচ্ছেমতো চলেন ভাড়াটেরা। বাড়িভাড়া নিয়ে কাগজে-কলমে একটি আইন থাকলেও তার কোনো কার্যকারিতা নেই বললেই চলে। ফলে বাড়িওয়ালাদের বিরুদ্ধে ইচ্ছেমতো ভাড়া বৃদ্ধি, ভাড়াটেদের ওপর নানা শর্তারোপসহ বিভিন্নভাবে নির্যাতনেরও অভিযোগ পাওয়া যায়।
আইনশৃঙ্খলার অবনতি : সারাদেশের মতো সম্প্রতি রাজধানীতেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। নগরবাসীর জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই। ঘরে-বাইরে সবখানেই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে মানুষ। চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের পাশাপাশি সন্ত্রাসীদের তত্পরতা বাড়ায় জনসাধারণকে সবসময় আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হচ্ছে। সম্প্রতি রাজধানীতে সন্ত্রাসীদের হামলায় ওয়ার্ড কমিশনার, ব্যবসায়ী, ছাত্রসহ বেশ কয়েকজনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। অপরদিকে ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকদের চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে নগরবাসীর মাঝে স্বস্তি নেই।
মশার উপদ্রব : জনদুর্ভোগের সারিতে যোগ হয়েছে মশার ভয়াবহ উপদ্রব। সম্প্রতি ব্যাপকহারে মশা বৃদ্ধি পাওয়ায় দিনের বেলায়ও ঘরে মশারি টাঙিয়ে থাকতে হচ্ছে। মশা নিধনের ব্যাপারে ডিসিসির তেমন উদ্যোগ নেই। কোনো জায়গায় নামমাত্র ওষুধ স্প্রে করা হলেও তাতে কোনো কাজ হচ্ছে না বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ।
রাজধানীর নানা সমস্যা সম্পর্কে বিশিষ্ট নগরবিদ ও ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, বহুদিন ধরে এসব সমস্যা বিরাজমান। তাই যতই দিন যাবে সমস্যা ততই বাড়বে। পুঞ্জীভূত সমস্যার দিকে আরও সুষ্ঠু পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে হবে। যানজট ও বিদ্যুত্ সমস্যার সমাধানে সরকার বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়া শুরু করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যানজট কমাতে স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপে কিছু কাজ হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে নতুন ট্রেন ও বাসলাইন চালু, আরও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে পাতাল রেল চালু এবং ঢাকায় যাতে নতুন মানুষ না আসে সেজন্য বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। ঢাকার চারপাশের জলাভূমি সংরক্ষণ করতে হবে। বুড়িগঙ্গা উদ্ধারে সরকারকে আরও সুপরিকল্পিতভাবে হাত দেয়া উচিত ছিল বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, নগরীর সমস্যা সমাধানে সরকারের শুধু সদিচ্ছা থাকলেই হবে না; পরিকল্পনাগুলো আরও সুপরিকল্পিত হতে হবে এবং তাতে জনগণের অংশগ্রহণ ও সচেতনতা বাড়ানো দরকার।
বিদ্যুত্, গ্যাস ও পানি সঙ্কট : বিদ্যুত্, গ্যাস ও পানি সঙ্কট নগরবাসীর একটি নিয়মিত সমস্যা। গরমের মৌসুম পুরোপুরি শুরু না হতেই বিদ্যুতের লোডশেডিং অসহনীয় হয়ে উঠেছে। দিনে ও রাতের অধিকাংশ সময়ই বিদ্যুত্ থাকছে না। এতে কলকারখানা, অফিস-আদালতের কর্মকাণ্ডে যেমন ব্যাঘাত ঘটছে, তেমনি আবাসিক এলাকার মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বিদ্যুত্ না থাকায় গরমে কষ্ট করতে হচ্ছে। এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা চলছে কিন্তু বিদ্যুত্ সঙ্কটে ছাত্রছাত্রীরা লেখাপড়া করতে পারছে না। পিডিবির হিসাবে বৃহস্পতিবার ঢাকায় লোডশেডিং করা হয়েছে ১৮২ মেগাওয়াট। চাহিদা কম দেখানোর কারণে লোডশেডিংয়ের পরিমাণও কম প্রদর্শিত হয়েছে। বাস্তবে ঢাকায় এখন বিদ্যুত্ ঘাটতি ৫শ’ মেগাওয়াটের বেশি বলে বিতরণ কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে।
বিদ্যুত্ সঙ্কটের হাত ধরে পানি সঙ্কটও প্রকট হয়ে উঠেছে। বিদ্যুতের অভাবে পানি তোলা যাচ্ছে না। ফলে বিভিন্ন এলাকায় পানির জন্য হাহাকার শুরু হয়েছে। পানি না থাকায় গোসল ছাড়াই অফিসে যেতে হয় অনেক চাকরিজীবীকে। রান্নাবান্না, ধোয়ামোছার কাজ তো বিঘ্নিত হচ্ছেই।
এছাড়া গ্যাস সঙ্কটের কারণে রান্নাবান্নায় অচলাবস্থা সৃষ্টি হচ্ছে। মগবাজার, রামপুরা ও বনশ্রীসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে নয়াটোলা, গ্রিনওয়েসহ এসব এলাকার বাসায় দিনের বেলা ঠিকমতো গ্যাস থাকে না। তাই অনেক রাতে গ্যাস এলে সারাদিনের রান্না তখনই সেরে নিতে হচ্ছে। গ্যাস সমস্যার কারণে মাটির বা কেরোসিনের চুলা ব্যবহার করছে অনেকে। এতে একদিকে গ্যাসের বিল নিয়মিত পরিশোধ করতে হচ্ছে; অন্যদিকে কাঠ বা তেলের জন্য অতিরিক্ত টাকা খরচ করতে হচ্ছে। আর ভোগান্তি তো আছেই।
যাতায়াত সমস্যা : বর্তমানে রাজধানীর প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে যাতায়াত সমস্যা। ভয়াবহ যানজট, প্রয়োজনীয় যানবাহন সঙ্কট আর ভাঙাচোরা রাস্তার কারণে এই দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ। সূত্রমতে, রাজধানীতে যানজটের মাত্রা প্রতিদিনই সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সপ্তাহের প্রতিদিন সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত এই যানজট থাকে। তবে রোববার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এর মাত্রা থাকে বেশি। গত কয়েকদিন ধরে গরম পড়তে শুরু করায় যানজটে যাত্রীসাধারণের দুর্ভোগও বেড়েছে। যানজটের কারণে প্রতিটি সিগন্যালে অনেক সময় দাঁড়িয়ে থাকায় ১৫/২০ মিনিটের পথ পার হতে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত লেগে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। অটোসিগন্যাল বাতিগুলো কোনো কাজে আসছে না। ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশারায় ইচ্ছামতো সিগন্যাল দিয়ে গাড়ি পারাপার করা হয়। দীর্ঘসময় ভিড়ের মধ্যে গাড়িতে থাকায় গরমে যাত্রীদের নাভিশ্বাস উঠছে। যানজটের পাশাপাশি যানবাহন সঙ্কটেরও অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে, সকালে অফিস ও স্কুল-কলেজ শুরুর সময় এবং বিকালে ছুটির সময় সংশ্লিষ্টদের যানবাহনের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। কারণ যাত্রীর তুলনায় পর্যাপ্ত যানবাহন নেই। তারপর আবার সিটিং সার্ভিস, গেট লক, ডাইরেক্ট, কাউন্টার সার্ভিস, লোকাল নানা নামে পাবলিক বাস কর্তৃপক্ষের দৌরাত্ম্য তো আছেই। অপরদিকে অনিয়ন্ত্রিত ট্যাক্সি ক্যাব, সিএনজি অটোরিকশা— এসব বাহনে যেমন ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করা হয় তেমনি পছন্দের জায়গা ছাড়া যেতে চায় না। সব সড়কে রিকশা না চলায় কম দূরত্বে যাতায়াতকারী সাধারণ মানুষকেও পোহাতে হয় দুর্ভোগ। অসুস্থ, মহিলা ও শিশুদের বাধ্য হয়েই অনেক পথ হেঁটে যাতায়াত করতে হয়। যাতায়াতের আরেক সমস্যা ভাঙাচোরা রাস্তা। বিভিন্ন কাজে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি অব্যাহত থাকায় আবাসিক এলাকার অধিকাংশ রাস্তা এমনকি প্রধান সড়কেরও অনেক জায়গা জরাজীর্ণ ও ভাঙাচোরা থাকে। ফলে যানবাহন ও মানুষের চলাচলে চরম সমস্যা হচ্ছে। যাত্রীদের যাতায়াত সমস্যার দ্রুত সমাধানে সমন্বিত কোনো উদ্যোগ কর্তৃপক্ষের আছে বলে মনে হয় না।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি : নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম প্রতিদিনই বাড়ছে। চাল, ডাল, তেল, তরিতরকারি, মাছ-মাংস, মসলাসহ সব জিনিসের দামই আকাশছোঁয়া। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচারণা হলেও তা নিয়ন্ত্রণ করতে বর্তমান প্রশাসন যেন ব্যর্থ হচ্ছে। বরং সরকারের এ নিয়ে তেমন কোনো মাথাব্যথা নেই বলেও মনে হচ্ছে। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের খেয়ে-পরে জীবনধারণ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
লাগামহীন বাড়িভাড়া : দ্রব্যমূল্যের পাশাপাশি রাজধানীতে লাগামহীনভাবে বাড়ছে বাড়িভাড়া। ফলে কম আয়ের মানুষের ভাড়া বাসায় বসবাস করা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। এ বিষয়ে যেন কোনো নিয়মকানুন নেই। বাড়িওয়ালাদের ইচ্ছেমতো চলেন ভাড়াটেরা। বাড়িভাড়া নিয়ে কাগজে-কলমে একটি আইন থাকলেও তার কোনো কার্যকারিতা নেই বললেই চলে। ফলে বাড়িওয়ালাদের বিরুদ্ধে ইচ্ছেমতো ভাড়া বৃদ্ধি, ভাড়াটেদের ওপর নানা শর্তারোপসহ বিভিন্নভাবে নির্যাতনেরও অভিযোগ পাওয়া যায়।
আইনশৃঙ্খলার অবনতি : সারাদেশের মতো সম্প্রতি রাজধানীতেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। নগরবাসীর জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই। ঘরে-বাইরে সবখানেই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে মানুষ। চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের পাশাপাশি সন্ত্রাসীদের তত্পরতা বাড়ায় জনসাধারণকে সবসময় আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হচ্ছে। সম্প্রতি রাজধানীতে সন্ত্রাসীদের হামলায় ওয়ার্ড কমিশনার, ব্যবসায়ী, ছাত্রসহ বেশ কয়েকজনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। অপরদিকে ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকদের চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে নগরবাসীর মাঝে স্বস্তি নেই।
মশার উপদ্রব : জনদুর্ভোগের সারিতে যোগ হয়েছে মশার ভয়াবহ উপদ্রব। সম্প্রতি ব্যাপকহারে মশা বৃদ্ধি পাওয়ায় দিনের বেলায়ও ঘরে মশারি টাঙিয়ে থাকতে হচ্ছে। মশা নিধনের ব্যাপারে ডিসিসির তেমন উদ্যোগ নেই। কোনো জায়গায় নামমাত্র ওষুধ স্প্রে করা হলেও তাতে কোনো কাজ হচ্ছে না বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ।
রাজধানীর নানা সমস্যা সম্পর্কে বিশিষ্ট নগরবিদ ও ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, বহুদিন ধরে এসব সমস্যা বিরাজমান। তাই যতই দিন যাবে সমস্যা ততই বাড়বে। পুঞ্জীভূত সমস্যার দিকে আরও সুষ্ঠু পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে হবে। যানজট ও বিদ্যুত্ সমস্যার সমাধানে সরকার বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়া শুরু করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যানজট কমাতে স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপে কিছু কাজ হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে নতুন ট্রেন ও বাসলাইন চালু, আরও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে পাতাল রেল চালু এবং ঢাকায় যাতে নতুন মানুষ না আসে সেজন্য বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। ঢাকার চারপাশের জলাভূমি সংরক্ষণ করতে হবে। বুড়িগঙ্গা উদ্ধারে সরকারকে আরও সুপরিকল্পিতভাবে হাত দেয়া উচিত ছিল বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, নগরীর সমস্যা সমাধানে সরকারের শুধু সদিচ্ছা থাকলেই হবে না; পরিকল্পনাগুলো আরও সুপরিকল্পিত হতে হবে এবং তাতে জনগণের অংশগ্রহণ ও সচেতনতা বাড়ানো দরকার।