ভর্তুকির চাপ বড় হচ্ছে বিদ্যুৎ পেতে মরিয়া সরকার

ভর্তুকির চাপ বড় হচ্ছে বিদ্যুৎ পেতে মরিয়া সরকার

তৌহিদুল ইসলাম

ঘন্টায় ঘন্টায় লোডশেডিং, কিছুটা বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে ডে-লাইট সেভিং, বিপণীবিতানগুলোকে সন্ধ্যার পর বন্ধ করে দেয়া, বিদ্যুৎ কখনো শহর, কখনো গ্রামে সরবরাহ করা, সার কারখানা বন্ধ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা- এমনসব পরীক্ষা-নিরিক্ষার পরেও মহাজোট সরকারের ১৫ মাসে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির সামান্যতম উন্নতি হয়েছে, একথা বোধ করি সরকারের লোকজনও বলতে কুন্ঠাবোধ করবেন। একটি দেশের অর্থনীতির চাকা কতোটা দ্রুত ঘুরবে তার একটা বড় মাপকাঠি হচ্ছে বিদ্যুৎ বা জ্বালানির নির্বিঘœ সরবরাহ দেশটিতে কতো, তার উপর। দেশে বিদ্যুৎ সংকটটা এখন এমন যে, বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারছে না। আর মাঝারি এবং ক্ষুদ্র ব্যবসা ও শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা করতে না পেরে প্রায় বন্ধ হবার উপক্রম হয়েছে। আর তাই দেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ পর্যš- সবার প্রশ্ন যেন এখন একটাই, কবে এই দমবন্ধ অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। সংকট নিরসনে প্রতিদিনই সরকারের উপর চাপ বাড়ছে।

জরুরি এ পরিস্থিতিকে সামাল দিতে সরকারও যেন কিছুটা মরিয়া হয়ে উঠেছে। এর বড় প্রমাণ, বিতর্ক বা প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে জেনেও দরপত্র ছাড়াই দরকষাকষির মাধ্যমে সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে যাচ্ছে সরকার। আর তা করতে এরই মধ্যে বিদ্যুতের কেনাকাটায় সরকারি ক্রয়নীতি শিথিল করার সিদ্ধাš- চূড়াš- করা হয়। অর্থমন্ত্রী এ সিদ্ধাš- গ্রহণের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, দেশের বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি পরিস্থিতি একটি জটিল সংকটের আবর্তে রয়েছে। এর থেকে আপদকালীন মুক্তি পেতেই এ ব্যবস্থা। সংকটের চেহারা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, চাহিদার তুলনায় বিদ্যুতের উৎপাদন কম হচ্ছে এটা যেমন সত্য, তেমনি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল প্রধানত গ্যাসের সরবরাহ পর্যাপ্ত নয়। শুধু গ্যাস স্বল্পতার কারণেই বর্তমানে গড়ে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। যে সমস্যার সমাধান অল্প দিনে তো নয়ই, আগামী কয়েকবছরেও সম্ভব নয়। আর তাই সরকার বিকল্প জ্বালানি ডিজেল বা ফার্নেস অয়েলে চলে এমন ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে দরপত্র ছাড়াই সংশ্লিষ্ট কোম্পানির সাথে দরকষাকষির মাধ্যমে এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেনার সিদ্ধাš- নিয়েছে। ডিজেল বা ফার্নেস অয়েল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ কিছুটা বেশি হওয়ায় এখাতে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণও হবে বিশাল।

আপদকালীন কুইক রেন্টাল

জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনকে সরকার কুইক রেন্টাল নামে অভিহিত করছে। এসব কেন্দ্র থেকে আগামী ছয়মাসের মধ্যে বড় আকারের বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব হবে। এর মধ্যে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতাসম্পন্ন তিনটি কুইক রেন্টাল প্ল্যান্ট স্থাপনের অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এর একটি স্থাপন করবে দেশ এনার্জি লিমিটেড, আর ২টি কেন্দ্র বসাবে যুক্তরাজ্যভিত্তিক এগ্রিকো ইন্টারন্যাশনাল। এগ্রিকোর ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র বসবে খুলনায়, আরেকটি ঘোড়াশাল। সরকার তাদের কাছ থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনবে ১৪ টাকা ৩৯ পয়সা দরে। আর দেশ এনার্জি লিমিটেড বিদ্যুৎ কেন্দ্র করবে সিদ্ধিরগঞ্জে। তাদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনা হবে ১৩ টাকা ৩৩ পয়সা দরে।এসব কুইক রেন্টাল থেকে সরকারকে বিদ্যুৎ কিনতে প্রতিমাসে ২০৪ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। তাতে বার্ষিক ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়াবে ২ হাজার ৪৪৮ কোটি টাকা, যা আগামী তিন বছর সরকারকে নিয়মিত পরিশোধ করে যেতে হবে। এর মধ্যে এগ্রিকো ইন্টারন্যাশনালকে দিতে হবে ১ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা এবং দেশ এনার্জি লিমিটেডকে পরিশোধ করতে হবে ৬৪ কোটি টাকা। এগ্রিকোর কাছ থেকে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে চার থেকে পাঁচ মাসের মধ্যে, আর দেশ এনার্জি প্রথম ৫ মাসের মধ্যে দেবে ৫০ মেগাওয়াট আর বাকী ৫০ মেগাওয়াট বসাবে পরবর্তী ৫ মাসে।

ভর্তুকির খরচ কতোটা বিশাল তার একটা তুলনা পাওয়া যাবে, সম্প্রতি সরকারের অনুমোদন দেয়া কয়েকটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরির ব্যয় হিসেব করলে। সরকার ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কিনতে গিয়ে প্রতি বছর যে অর্থ খরচ করবে তা দিয়ে কমপক্ষে একই ক্ষমতার তিনটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা সম্ভব। সরকারের পরিকল্পিত এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কুইক রেন্টাল থেকে কেনা হলে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ১০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি দাঁড়াবে বলেই মনে করা হচ্ছে। যদিও অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, এবার বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ কৃষিখাতের কাছাকাছি হতে পারে। কৃষিখাতে প্রতিবছর ভর্তুকি দেয়া হয় ৫ থেকে ৬ হাজার কোটি টাকা। তবে সরকার বিদ্যুৎ খাতে কতোটা ভর্তুকি দেবে, তা নির্ভর করবে বিদ্যুতের দাম কতোটা বাড়ানো হবে তার উপর। বিদ্যুতের বর্তমান দাম বহাল থাকলে ভর্তুকির পরিমাণ আরো বেশি হবে বলেই সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। অর্থমন্ত্রী অবশ্য বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনা এবং ভর্তুকি দেয়ার বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, বিদ্যুৎ খাতের অবস্থা গেল কয়েকবছরে যে নাজুক জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তা কাটাতে অর্থনীতিকে ভর্তুকির এ বোঝা বহন করতেই হবে।

কুইক রেন্টাল ছাড়াও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড পিডিবি জরুরি ভিত্তিতে আরো ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেনার জন্য দেশী দুটি কোম্পানির সাথে সমঝোতা চুক্তি করেছে। নতুন চুক্তি অনুযায়ী সামিট গ্র“পের খুলনা পাওয়ার কোম্পানি কেপিসিএল গোয়ালপাড়ায় তাদের বর্তমান একশ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্রে আরো ১১৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার আরেকটি ইউনিট বসাবে। কোম্পানিটি নারায়নগঞ্জের মদনগঞ্জে আরো একটি প্ল্যান্ট কুইক রেন্টাল হিসেবে বসাবে। এসব কেন্দ্র থেকে সরকার বিদ্যুৎ কিনবে পাঁচ বছরের জন্য। একইসাথে ওরিয়ন গ্র“পের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ইন্টিগ্রেটেড পাওয়ার কোম্পানি গাজীপুরের কড্ডায় ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি কেন্দ্র বসাবে। এসব কেন্দ্রে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হবে ফার্নেস ওয়েল। ফার্নেস ওয়েলে করা কেন্দ্রের উৎপাদনে খরচ ডিজেল চালিত কেন্দ্রের অর্ধেক হবে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্টরা। তারপরও এসব কেন্দ্র থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হবে কমপক্ষে চার টাকা।

মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা
বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে সরকার স্বল্প মেয়াদের পাশাপাশি মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে নতুন নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা চূড়াš- করেছে। আগামী এক বছরের মধ্যে সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষ করতে চায় সরকার। আছে বিদ্যুৎ আমদানিরও পরিকল্পনা। এর মধ্যে ১০০ মেগাওয়াট থেকে শুরু করে ১৩৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা চূড়াš- করা হয়েছে। কিন্তু দরপত্র প্রক্রিয়া আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং গোষ্ঠীস্বার্থের দ্বন্দ্বের কারণে যথাসময়ে এসব প্রকল্প আলোর মুখ দেখবে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিকল্পিত সব প্রকল্প বা¯-বায়ন করতে কমপক্ষে ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ উপদেষ্টা জানিয়েছেন, সরকার এর জন্য ১০০ কোটি ডলারের একটি বিদ্যুৎ ফান্ড গঠনের পরিকল্পনা নিয়েছে। কিন্তু ফান্ড তৈরির তেমন কিছুই এখনো চূড়াš- হয়নি। তাই বা¯-বায়নের সংশয়টা থেকেই যাচ্ছে।

প্রাথমিক জ্বালানির নিশ্চয়তা

দেশে গ্যাস উৎপাদনের যে অবস্থা তার উন্নতি একদিনে সম্ভব নয়। এ অবস্থায় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে একদিকে বড় ধরনের বিনিয়োগ, অন্যদিকে প্রচুর সময়েরও প্রয়োজন হবে। এ অবস্থায় দ্রুত গ্যাস সমস্যা সমাধানে এলএনজির মাধ্যমে গ্যাস আমদানির পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এরই মধ্যে কাতারের সাথে এলএনজি আমদানির ব্যাপারে দরকষাকষি শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। এলএনজির মাধ্যমে আমদানি করা গ্যাস দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন কিছুটা বাড়ানো সম্ভব হবে। তারপরও এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন এবং সেখান থেকে পাইপ লাইনের মাধ্যমে ভুখন্ডে গ্যাস নিয়ে আসতে সময় লাগবে তিন থেকে চার বছর।
একইসাথে গ্যাসের বিকল্প হিসেবে সরকার কয়লা ব্যবহারের উপরও জোর দিচ্ছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী বড়পুকুরিয়ার কয়লা উন্মুক্ত পদ্ধতিতে করা যায় কিনা, করলে কি পরিমাণ কয়লা পাওয়া সম্ভব হবে তার একটা হিসাব বের করতে জ্বালানি মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন। আর অর্থমন্ত্রী উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের সুফল কুফল বুঝতে একটি পরীক্ষামূলক খনি চালুর পরামর্শ দিয়েছেন। একইসাথে খনি এলাকার পরিবেশ এবং ক্ষতিগ্র¯- লোকদের উদ্বুদ্ধ করতে কাজ শুরু করার পরামর্শ দিয়ে একটি চিঠি দিয়েছেন জ্বালানি মন্ত্রণালয়কে। তারও আগে বহুল আলোচিত কয়লা নীতি চূড়াš- করার তাগিদও দেয়া হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এসব ক্ষেত্রে যেসব রাজনৈতিক এবং সামাজিক বাধার মুখে পড়তে হবে তার কতোটা সরকার দ্রুত সমাধান করতে পারবে সেটাই সেটাই মূল বিবেচ্য। জ্বালানি সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে সময়ই এখন বড় প্রতিদ্বন্দ্বী।

Related Posts


We will keep You Updated...
Sign up to receive breaking news
as well as receive other site updates!
Sponsors


Featured Video
Sponsors
Popular Posts

Climate Change a Hot Story Here

Climate Change a Hot Story Here Glenn Baker October 7, 2009 Sponsored by the Pulitzer Center on Crisis Reporting Climate change is front page news in Bangladesh on a...

Immeasurable' losses feared as embankment rebuilding falls behind

'Immeasurable' losses feared as embankment rebuilding falls behind 24 Feb 2010 15:23:00 GMT Written by: AlertNet correspondent Makeshift huts sit on a heavily eroded...

BPC team to visit Malaysia, Singapore for fuel deals

BPC team to visit Malaysia, Singapore for fuel deals Staff Correspondent . Chittagong A 4-member Bangladesh Petroleum Corporation team is scheduled to leave for Malaysia...

PM urges businessmen to use solar power in offices

FE Report Prime Minister Sheikh Hasina Thursday urged the business community to use solar power in their offices to reduce pressure on the national grid. She said...

All set for Dhaka-Moscow nuclear agreement

All set for Dhaka-Moscow nuclear agreement BSS, Dhaka The government will sign an agreement with Russia on May 21 next for bolstering cooperation for peaceful use of atomic...
Flickr RSS
share this site
Share |
Categories
visitor from 1-3-10
Recent Posts

Is energy security achievable in Bangladesh?

Is energy security achievable in Bangladesh? Only coal cannot meet our energy needs. Photo: washingtonpostAhmed...

ADB raises assistance to improve clean energy access

ADB raises assistance to improve clean energy access Bss, Dhaka The Asian Development Bank (ADB)...

Bangladesh govt signs deal with US oil giant ConocophilLips this month

Govt signs deal with US oil giant this month // < ![CDATA[// // < ![CDATA[// FE Report The...

CNG pump owners for lifting of six-hour closure order

CNG pump owners for lifting of six-hour closure order The call aims at easing...

Cairn to be allowed to sell its gas to third party in BD

Cairn to be allowed to sell its gas to third party in BD Petrobangla set to sign...
Recent Comments
... This post was Twitted by sanjoychakibd ...
... This post was mentioned on Twitter by Sanjoy Chaki, bd Energy Link. bd Energy Link said: Low-cost biogas digester may soon brigh
... This post was mentioned on Twitter by Sajid Chowdhury, Sajid Chowdhury and Sanjoy Chaki, bd Energy Link. bd Energy Link said: Na
... Tk 561cr subsidy w&#1110&#406&#406 b&#1077 needed a year f&#959r high-cost electricity ...
... This post was mentioned on Twitter by Sanjoy Chaki, bd Energy Link. bd Energy Link said: নতুন গ্যাস পাও
Tag Cloud